কালকূট মানেই সফরনামা। অনন্ত পথের পাঁচালি। ওই যে পথের দেবতা প্রসন্ন হেসে বললেন, ‘মূর্খ বালক পথ তো আমার শেষ হয়নি।’ পুরনো পথ ছেড়ে ঐতিহ্য বুকে আঁকড়ে, নতুন পথে যাত্রা করেছেন বারবার। দেবতার মতোই নিস্পৃহ হয়ে যা ঘটেছে তার সাক্ষী থেকেছেন। মাধুকরীর কাঁড়া আকাঁড়া চালে ভরে গেছে তাঁর ঝুলি। কনকাঞ্জলির মতো তাঁর এক–একটি লেখায় ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের অতল অনুভূতির ধারাবিবরণী।
কত অজানা মনের মানুষ বাস করে এই পৃথিবীতে। রীতিনীতি, পোশাক–আশাক, ভাষা–অভাষায় কত বিচিত্র তারা। প্রকৃতির রূপ–রস–গন্ধে হারিয়ে গেলেও মানুষকে কখনও ভোলেননি কালকূট। এক এক করে পরখ করেছেন মানুষের ভিড়ে। যে মাটিতে মিশে আছে ইতিহাস, পুরাণ— সেখানেও খুঁজেছেন মানবসত্য।
ওপার বাংলার বুড়িগঙ্গা, বাল্যকালের স্মৃতির মতোই চির–গভীর। বঙ্কিম বলেছেন, বাল্যপ্রেম অভিশাপ। তাই একাদশ বর্ষীয় বালকের প্রেম খুঁজে ফিরেছে মানবরতন। গান, ছবি, বাঁশিতে বেজে উঠেছে বৃন্দাবনী বিরহ। রাধা–মাধবের মতো কালকূটও বাল্যপ্রেমে চিরকালের নরনারী হতে চেয়েছেন। ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে’-র তাড়নায় ছুটে বেরিয়েছেন রাজগীর, দিল্লি, বোম্বাই, কামাখ্যা, পাহাড়ে–বনে–গ্রামে, ইতিহাস আর পুরাণের দেশে। কিন্তু তাঁকে ছায়া দিয়েছে ছেলেবেলার শীতলক্ষা নদী। বিংশ শতকের পাঁচের দশকে লেখকের কলমে তাঁর আনুষ্ঠানিক আবির্ভাব হলেও ছেলেবেলায় সুরথনাথের খামখেয়ালিপনায় লুকিয়ে ছিল ওঁর কালকূটসত্তা। ‘কালকূটের চোখে সমরেশ বসু’ রচনায় তিনি বলেছেন, ‘ও তো কালকূট না, বিষ নিয়ে, বিষে জরজর। রাগে আর ঘৃণায়, কখনও কখনও খ্যাপা। দশ বছর বয়সের ছেলেটার মধ্যে, সেই প্রতিক্রিয়াটাই যেন দেখেছিলাম।’
কালকূট
সেই ১৯৫২ সালে ‘কালকূট’ ছদ্মনামের জন্ম। নেহাতই তাৎক্ষণিক একটি রচনার প্রয়োজনে। সেই রচনাটির কথা আজ কারও হয়তো মনে নেই। রাজনৈতিক রচনা ছিল সেটি। সাময়িক প্রয়োজন মিটিয়েছিল। কিন্তু ‘কালকূট’ নামটি বাংলা সাহিত্যে চিরকালীন নাম হয়ে উঠল আরও দু-বছর বাদে। যখন ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ প্রকাশিত হল। লেখক কালকূটের জন্ম সেই ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ই।অমৃতকুম্ভের সন্ধানে যে-যাত্রার শুরু সেই যাত্রা আজও অব্যাহত। কালকূটের নিজের ভাষায় বলতে গেলে, ‘পুরাণ আর ইতিহাসের স্মৃতি, আর সারা ভারতের মানুষ, তাদের ভাষা পোশাক খাদ্য আর নানান ধর্মীয় আচরণ। মনে হচ্ছে আমি যুগ থেকে যুগান্তের এক লীলাক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছি। এই রূপের মধ্যে আমার চোখে ভেসে উঠছে, হাজার হাজার বছর আগের নানান ঘটনা। যেন এক আবছায়ায় আমি সবাইকে দেখতে পাচ্ছি।’ এই দেখা কালকূটের রচনার মধ্য দিয়ে এক মহাদর্শনে পরিণত।

















Reviews
There are no reviews yet.