এটা ঠিকই যে, স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির কোন নির্ণায়ক ভূমিকা ছিল না। তা যদি থাকত, তবে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও বেকারি এবং সমস্ত রকম বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির শিকার, কলহ-জর্জরিত এক জাতির চেহারা নিয়ে আজকের যে শোচনীয় পরিস্থিতি, ভারতীয় জনসাধারণকে তার সম্মুখীন হতে হতো না।
👆স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বের যে রাশ, তা বেশ শক্তভাবেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বুর্জোয়া নেতৃত্বের হাতেই ধরা ছিল। এমনকি কোন গণসংগ্রাম যখন কংগ্রেস-নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে যেত, জনসাধারণ সশস্ত্র প্রতিরোধেও প্রবৃত্ত হতো, তখনও কিন্তু এই নেতৃত্বের অনুগামী জনগণের চেতনায় কোন পরিবর্তন ঘটত না। এ কারণে সেই সংগ্রামও সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়তে পারত না।
কিন্তু কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রচার, প্রসার ও তাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন ধর্মঘট সংগঠিত হতে দেখে, ১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ বড়লাট লর্ড আরউইন আইনসভায় প্রদত্ত তাঁর ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, ” কমিউনিস্ট মতবাদের উদ্বেগজনক প্রসারলাভ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে”।
ইংল্যাণ্ডের ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকায় (১৯২৯ সালের আগস্টে) তিনি লিখেছিলেন, “বিগত দুই বৎসরের ঘটনা এটাই প্রমাণ করেছে যে, বিবেকবর্জিত কমিউনিস্ট সংগঠকদের হাতে শিল্প শ্রমিকরা এক অদ্ভুত নমনীয় উপাদান।
একই সুরে জাতীয় কংগ্রেসের মুখপত্র বম্বে ক্রনিক্যাল পত্রিকা লিখেছিল, ” আকাশে বাতাসে এখন সমাজতন্ত্রের কথা। বিগত মাসগুলিতে ভারতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সম্মেলনে, বিশেষ করে শ্রমিক ও কৃষকদের সম্মেলনগুলিতে এই সমাজতন্ত্রের মূল নীতিগুলি প্রচার করা হয়েছে।”
এই সবের ফলশ্রুতিতে, ব্রিটিশ আমলের সমস্ত কালটা জুড়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি একটা বে-আইনি পার্টি ছিল। ১৯৩৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বাধীন ইয়ং ওয়ার্কার্স লিগের মতো বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও সংগঠনকে বে-আইনি বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।
১৯৩৭সালে, যখন কতিপয় রাজ্যে কংগ্রেস-মন্ত্রিত্ব ক্ষমতাসীন হলো, কেবলমাত্র তখনই এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার পরে ১৯৪০ সালে পার্টিকে আবার আত্মগোপন করতে হয় এবং সেই সময়ে পার্টির বহুসংখ্যক জনপ্রিয় নেতাকে আটক করা হয়েছিল। ১৯৪২ সালে ফ্যাসিস্ট-বিরোধী যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানানোর পরেই একমাত্র পার্টি প্রকাশ্যভাবে কাজ করার সুযোগ পায়।
দূরদৃষ্টি দিয়ে কমিউনিস্টরা একথাও বুঝেছিল যে, জনযুদ্ধে অর্জিত জয় ভারতীয় সমাজের সমগ্র শক্তির উদ্যমকে শৃঙ্খলমুক্ত করে দেবে এবং তাকে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র শেষ সংগ্রামে লিপ্ত করবে। তারা বুঝেছিল যে, এ যুদ্ধের শেষে ভারতের জনগণ বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই সম্মুখপানে এগিয়ে চলবে।
পরবর্তী ঘটনাবলী প্রমাণ করেছে যে, কমিউনিস্টদের ধারণা সম্পূর্ণভাবেই সঠিক ছিল। এ যুদ্ধের শেষে একটা নতুন যুগের সূচনা পরিলক্ষিত হলো। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় সমাজতন্ত্র কায়েম হলো, সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল, এবং ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ শাসকরা সরে পড়তে বাধ্য হলো । যুদ্ধে বিজয়ী ব্রিটিশ ফৌজ ভারতীয় জনসাধারণের বিরুদ্ধে কোন দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে যেমন আর ইচ্ছুক ছিল না, তেমন-ই সক্ষমও ছিল না।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে কমিউনিস্টদের উজ্জ্বল ভূমিকা এই বইয়ে আলোচিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে, যা নতুন প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবে।












Reviews
There are no reviews yet.